বৃহস্পতিবার, ০৪ Jun ২০২০, ০৮:০৭ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
তাড়াশ উপজেলা প্রেসক্লাবের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন সম্পূর্ণ তাড়াশ উপজেলা প্রেসক্লাবের দ্বি- বার্ষিক নির্বাচন সম্পন্ন,,,,,,,, কালীগঞ্জে ২য় পর্যায়ে গ্রামীণ কৃষি ফাউন্ডেশানের খাদ্য সামগ্রী বিতরণ ২০ বছর পর স্বেচ্ছাশ্রমে হলো এক কিলোমিটার রাস্তা রায়গঞ্জে সাংবাদিক পুত্র নাঈমের অসাধারন কৃতিত্ব বর্ণ বিবাদ- কাব্য লালমনিরহাটে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় দলিল লেখকের মৃত্যু ঘাটাইলে শিমলা গ্রামে পানিতে পরে এক শিশুর মৃত্যু দুপচাঁচিয়ায় বিজয় রক্তদান সংস্থার উদ্যোগে বিনামূল্যে ‘আর্সেনিকাম এ্যালবাম-৩০’ বিতরণ শাহজাদপুরে বাস ও অটোভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী ও শিশু কন্যা নিহত
জেল থেকে বাড়ি ফিরতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মা- সৌরভ সোহরাব

জেল থেকে বাড়ি ফিরতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মা- সৌরভ সোহরাব

জেল থেকে বাড়ি ফিরতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন মা

সৌরভ সোহরাবঃ
টানা ২১ দিন জেল খাটা পর যখন খালাশ পেয়ে বাড়ি ফিরলাম তখন আমাদের বাড়িতে দুই ছেলেকে কাছে পেয়ে মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। মায়ের বুক ফাটা কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। পাড়ার লোকজন জড়ো হলো। প্রতিবেশী চাচী,দাদীরা মা কে বোঝাতে লাগলেন ছেলে দুটো তো ফিরে এসেছে এখন কান্না থামান। মায়ের কান্না থামলো না। আমাদের দুই ভাইকে জড়িয়ে আরও বেশি সময় নিয়ে কাঁদতে লাগলেন।

আজ ১২ মে বিশ্ব মা দিবস। আমার মা’কে নিয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনার কিছু অংশ উপরের চিত্র।

এবার পুরো ঘটনা বলি, ২০০০ সালের জানুয়ারী মাস। একটি সহস্রাব্দের সুচনা লগ্ন। রমজান মাস। শীতকাল। ২৬ রমজানের রাত। মা সেহেরী পাক করছেন। হঠাৎ শো শা,ফিস ফাস শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। টের পেলাম অনেক লোকজনের পায়ের শব্দ। ফিস ফাস করে একজন বলছেন এই ঘরেই থাকে। ডাকেন। দরজা খুলতে বলেন। পাশে ঘুমানো ছোট ভাই শামীমকে জাগালাম। শামীম জাগলো। জানালা দিয়ে উকি মারতেই দরজায় ধাক্কা। পুলিশ ঘরে ঢুকলেন। আমাকে ধরে দোতলা ঘর থেকে নীচে নামালেন। নীচে এসে দেখলাম ছোট ভাই সিহাব এবং মেঝ চাচা আব্দুস ছালামকে ধরে দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে ওরা।

আমি সে সময় বগুড়াতে অনার্স পড়ি। ছোট ভাই সিহাব থাকেন তাড়াশের লালুয়া মাঝিড়া হাইস্কুলে। তাঁর সামনে এস এস সি পরীক্ষা। ঈদ উপলক্ষে দুজনই বাড়িতে এসেছি। অামাদের শত্রু পক্ষ এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে ছিল।

যা হোক আমাকেও রশি দিয়ে বেধে ফেলা হলো। শীতের রাত। ১০-১২ জনের পুলিশের দল। পরনে মোটা লম্বা ব্লেজার। হাতে হাতে টর্চ লাইট। সব কিছুই ভয়ঙ্কর স্বপ্নের মত মনে হতে লাগলো। আমার মা তখন হাতে একটি বাতি জালিয়ে পাগলের মত ঘুরছে। মা পুলিশকে জিঙ্গেস করলো কি হয়েছে? আমার ছেলেরা চোর না ডাকাত। এভাবে ধরে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন। হায় আল্লা! আমার ছেলেদের বাঁচাও।

মায়ের চিৎকারে কেউ গুরুত্ব দিলনা না। শুধু একজন পুলিশ অফিসার শান্তনা দিয়ে বললো, দেখুন আমরাও আপনার সন্তানের মত। থানায় অভিযোগ আছে। সেই সুত্র ধরে আমরা দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের করার কিছুই নাই।

গ্রামের অনেক লোকজনই দাড়িয়ে দেখছে। কেউ কথা বলছেনা। মা তাদের কাছেও গেলেন। তোমরা কিছু বলো। আমার ছেলেরা চোর না ডাকাত। আমার অসহায় মায়ের কথা তারাও শুনলো না।

আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো বিয়াশ অপেক্ষা করা পুলিশের গাড়ীতে। সে সময় বিয়াশ রাতাল দিয়ে সিংড়া আসা লাগতো। বিয়াশ পাকা রাস্তায় সে রাতে প্রায় ৮-১০ টি পুলিশের গাড়ী আসামী ধরার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমাদের সহ সর্বহারার নামে মোট ১৮ জন আসামী ধরা হয়েছে। আসামীদের মধ্যে কেউ কেউ পরিচিত। এর মধ্যে একজন ছিল আমার কলেজ জীবনের বন্ধু। নাম নজরুল। বাড়ি আমার পাশের গ্রাম ঠেঙ্গাপাকুড়ীয়া। ছোট বেলা থেকে কবিতা লিখতো বলে আমরা ওকে কবি নজরুল বলে ডাকতাম। বন্ধ্ কবি নজরুলকে পেয়ে এই আতংক আর কষ্টের মধ্যেও একটু স্বস্তি পেলাম।

জামতলী বাজার এসে পুলিশের গাড়ী থামলো। সেহেরীর শেষ সময়। পুলিশের পক্ষ থেকে একজন বললো,যারা রোজা রাখবেন সেহেরী খেয়ে নিন। হাত বাধা অবস্থায় রুটি কলা আর একটু পানি দিয়ে সেহেরী খেলাম।

ভোরে সিংড়া থানায় হাজির করা পর সেই দিন সন্ধায় নিয়ে যাওয়া হলো সোজা নাটোর জেলা খানায়। জেল খানা সেদিন থমথমে অবস্থা। খবর পৌছে গেছে যে সিংড়ার চলনবিল এলাকা থেকে ১৮ জন সর্বহারার সদস্য গ্রেফতার করে জেল খানায় আনা হচ্ছে। যাই হোক এক রকম বড় মাপের সন্ত্রাসী হিসাবে সন্মানের সাথেই জেলখানায় প্রবেশ করলাম।

জেল খানাতেই কেটে গেল ঈদুল ফিতর। বাড়ি থেকে জামিনের চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু কোর্ট জামিন দিচ্ছেন না। জামিল না দেওয়ার কারন হলো সে সময় চলনবিল এলাকায় সর্বহারা নামক চরমপন্থির ব্যাপক তৎপরতা ছিল। এলাকার খুন,ডাকাত,ছিনতাই বেড়ে গিয়েছিল। এলাকায় যা কিছুই ঘটতো প্রায় অধিকাংশই নাম হতো সর্বহারাদের। মুলত সেসময় এই এলাকা ছিল সর্বহারা আতংক জনপদ। তাই পুলিশ প্রশাসনের নজরে ছিল এই চরমপন্থী দলের।

মুলত সর্বহারা সন্দেহেই আমাদের এই শাস্তি। বেনামী পিটিশনের উপর ভিত্তি করে পুলিশ আমাদেরকে ধরে আনে। সপ্তাহ খানেক আগে এলাকার পারিল বেড়াবাড়ি সহ কয়েকটি গ্রাম থেকে ব্যক্তি মালিকানা বন্দুক ছিনতাই হয়। এর প্রেক্ষিতেই আমাদের শত্রু পক্ষ পুলিশের সাথে যোগসাজশে এই সুযোগ নেয়। আমরা বিনা অপরাধে জেল খাটি।

যাই হোক ২১ দিন জেল খাটা পর আমরা নির্দোষী খালাশ পেয়ে জেল খানা থেকে বাড়ি ফিরি। দুই ছেলেকে এক সাথে পেয়ে মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এই কান্না খুশির কান্না। পরে জানতে পারলাম, যে কয়দিন আমরা জেলে ছিলাম সে কয়দিন মা তেমন কিছুই খেতে পারেননি। শুধু পাগলের মত ঘুরে ঘুরে কেঁদেছেন আর আমাদের পছন্দের খাবার গুলো সাজিয়ে অপেক্ষা করেছেন। কবে ছেলে দুটো আসবে সেদিন খাওয়াবেন।

জেল থেকে বাড়ি ফেরার দিন মায়ের নিজের হাতে রান্না করে আমাদের পছন্দের হরেক রকম খাবার খাইয়ে দিলেন। তার পরই মায়ের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।

আমার মা বেঁচে আছেন।
বিশ্ব মা দিবসে আমার মা সহ সকলের মা সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকুক আর যাঁদের মা নেই তাদের মা বেহেশত বাসী হউক এই প্রত্যাশা রাখি।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2014 radiobogra.net

Design & Developed By: Fendonus Limited