মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২০, ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
জয়পুরহাট জেলা বাসীকে ঈদ উল আয্হার শুভেচ্ছা জানিয়েছে ভাইস চেয়ারম্যান অশোক কুমার ঠাকুর জয়পুরহাট পৌর বাসীকে পবিত্র ঈদ উল আয্হার শুভেচ্ছা জানিয়েছে মেয়র মোস্তাক জয়পুরহাট জেলা বাসীকে ঈদ উল আয্হার শুভেচ্ছা জানিয়েছে সংবাদপত্র হর্কাস ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক শহিদুল জয়পুরহাটে করোনাভাইরাস রোগে আক্রন্ত হয়ে জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের মৃত্যু চার মাস পর রশিদ হত্যা মামলার রহস্য উম্মোচন সিরাজগঞ্জে বাসচাপায় একজন নিহত; গুরুতর আহত দুই জয়পুরহাট পৌর বাসীকে পবিত্র ঈদ উল আয্হার শুভেচ্ছা জানিয়েছে মেয়র মোস্তাক জয়পুরহাট জেলা বাসীকে ঈদ উল আয্হার শুভেচ্ছা জানিয়েছে ভাইস চেয়ারম্যান অশোক কুমার ঠাকুর করোনা জয় করলেন ইউএনও মহোদয় ও তার পরিবার তাড়াশে ভিজিএফ’র চাল বিতরণ

রাত্রি পেরিয়ে প্রহর

রাত্রি পেরিয়ে প্রহর

ফাতেমা-তুজ-জোহরা তিতলি

আজকের চাঁদ টা অসম্ভব সুন্দর। করীম মিয়া উঠানে দাঁড়িয়ে প্রায় ঘন্টা খানেক ধরে চাঁদ দেখে যাচ্ছে। আসলে চাঁদ দেখার মতো আয়েশ তার নেই। সে ভাবছে পরদিন কি করে দু পয়সা কামাই করা যায়। কিসব ভাইরাস ফাইরাসের কারণে রুজি-রোজগার সব বন্ধ হয়ে আছে৷ পোলার স্কুল বন্ধ, কিন্তু মাসে মাসে বেতন ঠিকই দেয়া লাগে।
করীম মিয়ার স্ত্রী জরিনা ও এক পুত্র বাবুই কে নিয়ে তার সংসার। রিকশা চালিয়ে কোনরকম তাদের দিন চলে যেতো। এখন এই অবস্থায় মানুষ বাসা থেকে বের হয় না বলে তার রিকশা চালিয়েও তেমন কিছু হচ্ছে না। সরকার ত্রাণ দেয় নাকি। ওই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই সব শেষ হয়ে যায়। শূন্য হাতেই ফিরে আসতে হয়। হঠাৎ জরিনার আগমন,
-কি গো, হেই কহন থেইকা এইহানে চুপ কইরা বইসা রইসো। কি ভাবতেসো? খাইবা না, না’কি?
জরিনার কথায় সচকিত হয়ে উঠে করীম মিয়া। নিজের চিন্তার জগতে জরিনাকে প্রবেশ করতে দেয় না। -চাঁদ টা মেলা সুন্দর আইজ। এইজন্যি দেখতেসিলাম।
-হ। আইজকা চাঁদের মন মর্জি ভালা মনে অইতাসে। চল খাইয়া লই। ঘুমাওন লাগবো।
-পোলা ঘুমাইসে?
-হ। ওরে খাওয়াইয়া ঘুম পাড়াই দিসি।
-আইচ্ছা দুজন মিলে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
রোজকার মতো সকালে পান্তা খেয়ে করীম মিয়া রিকশা নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো। গত তিন মাস পরিস্থিতি সামলে কোনরকম টেনে সংসার চালিয়েছে। পরিস্থিতি আবার আগের মতো হলে জানে বেঁচে যায়। সারাদিনে অপেক্ষা করে মাত্র ২৭০ টাকা কামাই আজ। কিভাবে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। হঠাৎ একজন লোক জিজ্ঞেস করলো,
-ধানমন্ডি যাবি?
-যামু স্যার।
-চল তাহলে।
-জ্বী।
-কেমন চলছে দিনকাল? রিকশা ভাড়া পাস এখন ঠিকমতো?
-না স্যার। সারাদিনে অল্প কিছু রোজগার হইসে মাত্র। অনেক কষ্টে দিন যাইতেসে।
-টাকা দরকার অনেক?
-হ স্যার। পোলার স্কুলের বেতন দিতে পারতেসি না। বাড়িত বাজার ও করতারি না। না খাইয়াই দিন যায়।
-আমার কাজ করবি একটা?
-কি কাম, স্যার?
-কাল সকালে ধানমন্ডি চলে আসবি। এখন যেখানে নামিয়ে দিয়ে যাচ্ছিস ওখানেই। এসে দেখা করবি। বাকি কথা কাল বলবো।
-আইচ্ছা।
বাড়ি ফিরার সময় করীম মিয়া বেশ চিন্তিত। লোকটা তাকে কোন ঝামেলায় ফেলবে নাতো? কিন্তু টাকার ও দরকার। যাই হোক। কাল দেখা যাবে কি হয়। বাড়ি ফেরার পরেই জরিনা জানলো, আজ বাজার সদাই কিছুই নেই। বাবুইর স্কুল থেকেও জানিয়ে দিয়েছে আর তিনদিনের মাঝে বেতন না দিলে নাম কাটা যাবে। করীম মিয়া কিছু বললো না। পকেটে ৩২০ টাকা আছে। তাই নিয়ে বাজারে গেলো। ১কেজি চাল আর ১হালি ডিম নিয়ে ফেরত এলো। জরিনা কিছু বললো না। স্বামীর অসহায়ত্ব বুঝতে পেরে দীর্ঘ্যশ্বাস ফেললো শুধু।
করীম মিয়া কিছুটা উৎসাহ, দ্বিধা, সংকোচ নিয়ে পরদিন সকালের অপেক্ষা করছে। জরিনা খাওয়ার জন্য ডাকায় খেতে গেলো। আজ বাবুই ঘুমায়নি। বাজানের সাথে খাওয়ার আশায় বসে আছে। তিনজন মিলে খেতে বসলো। বাবুই জিজ্ঞেস করলো,
-বাজান, আমার ইস্কুলে টাকা দিবা না? ওরা কি আমার নাম কাইটা দিবো?
-না রে বাজান। নাম কাটবো না। আমি ট্যাকার ব্যবস্থা করতাসি।
বাবুইর চোখে মুখে একটা তৃপ্তির হাসি দেখতে পেলো করীম মিয়া। এই হাসির জন্য সে সব করতে রাজী। আর কোন দ্বিধা নেই তার। কাল যে কাজই দেয়া হোক সে করবে। তার টাকার প্রয়োজন এখন।
পরদিন সকাল। করীম মিয়া না খেয়েই রিকশা নিয়ে ধানমন্ডির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। প্রায় ৩০মিনিটের মাঝে সে পৌঁছে গেলো। দরজায় নক করতেই দারোয়ান তাকে ইশারা দিয়ে একটা দরজা দেখিয়ে দিলো। করীম মিয়া দরজায় ধাক্কা দিয়ে প্রবেশ করতেই সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর।
-আমি জানতাম তুমি সময় মতো আসবা করীম মিয়া। ভাল আছ তো?
-জ্বী, আমারে আসতে কইসিলেন, স্যার। (করীম মিয়া আমতা আমতা করে বললো।)
-হুম। তোমার জন্য একটা কাজ আছে। যদি করতে পারো, ১০,০০০ টাকা পাবে।
-১০,০০০ ট্যাকা?!!
-হাহা, হুম।
-কি কাম, স্যার?
-তেমন কিছু না। কিন্তু যা বলবো, কথাগুলো যেনো আমাদের মাঝেই থাকে। বাইরে গেলে কিন্তু…
-না, না, স্যার। কেউ জানবো না। (করীম মিয়া এতোক্ষণে বুঝে গিয়েছে লোকটি হোমড়া-চোমড়া ব্যক্তি। একে ঘাটালে বিপদ হবে।
-ভাল। তোমাকে তেমন কিছু করতে হবে না। যা সত্যি তাই বলবে। সবার মাঝে ছড়িয়ে দিবে যে, সরকার নামের ত্রাণ দিচ্ছে। কয়েকজনকে দেখিয়ে শো-অফ করছে। তোমরা না খেয়ে মরতে বসেছো এই লকডাউনে। কি? পারবে না?
করীম মিয়া ভাবছে। এসব সরকারি কর্মকাণ্ডে জড়ালে বেশ বড় বিপদে না পড়ে যায়। কিন্তু যেহেতু এই লোককে আগেই হ্যাঁ বলে দিয়েছে এখন পিছিয়ে পড়াও বিপদ। তাই বললো,
-জ্বী স্যার। পারবো।
-গুড, আমি এটাই আশা করেছিলাম। কাল থেকে কাজে নেমে যাবা। এসে আমাকে জানাবা, কি হলো ঘটনা।
-আইচ্ছা, স্যার। আমি আসি তাহলে।
করীম মিয়া চিন্তিত। বেশ চিন্তিত। রিকশা চালালো কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক ভাবে। সামনে হঠাৎ দেখলো কিছু ডাক্তার আর পুলিশ আনন্দ উল্লাস করছে। মানুষের এই অসময়ে কেউ আনন্দ- উল্লাস করছে, তাও ডাক্তার-পুলিশ, ব্যাপারটা কেমন যেনো লাগছে! কাছে গেলো। এক পুলিশ দৌঁড়ে এসে করীম মিয়াকে রিকশা থেকে নামালো। করীম মিয়া হঠাৎ ভড়কে গেলো। পুলিশ ভাই হাসিমুখে বললো,
-আর কষ্ট করা লাগবে না ভাই। বাংলাদেশের এক ডাক্তার করোনা ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করে ফেলেছে। ভ্যাক্সিন মানে বুঝো নাই? আরে টীকা, মিয়া! আগামীকাল থেকে এই টীকা সবাইকে দেয়া শুরু হবে। আমরা সবাই আবার প্রাণ ভরে বাঁঁচবো। মুক্ত আকাশে প্রাণভরে শ্বাস নিবো। সরকার তোমাদের কিছু দান ও করবেন।
করীম মিয়া সব ঝাপসা দেখছে। আনন্দে তার চোখে জল এসে সব ঝাপসা করে দিয়েছে। সে আবার যাত্রী পাবে আগের মতো। ভয় নিয়ে আর বাঁচতে হবে না। ওই বেটার কুকর্ম ও তাকে করতে হবে না ১০,০০০ ট্যাকার জন্য। তার বাবুই ইস্কুলে যেতে পারবে। সবাই ভাল থাকবে, আনন্দে থাকবে। তার রিকশায় আগের মতো প্রেমিক যুগলের খুঁনসুটি দেখবে,বয়স্ক যুগলের হঠাৎ ভালোবাসা দেখবে, ব্যস্ত মানুষের তড়িঘড়ি দেখবে৷ পৃথিবী সুস্থ হয়ে উঠবে। করীম মিয়া খুশির কান্না করছে আজ। এ বড়ই খুশির দিন আজ।

আপনার সামাজিক মিডিয়া এই পোস্ট শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2014 radiobogra.net

Design & Developed By: Fendonus Limited